মানুষের সাথে
আচরণের ক্ষেত্রে পূর্বসূরিদের (সালাফ) কিছু অমূল্য বাণী।
একটি বিশেষ সংকলন
ও অনুবাদ —
আসসালামু আলাইকুম। মানুষের প্রকৃতি এবং চরিত্র বোঝার জন্য ইসলামের স্বর্ণযুগের মনীষীদের (সালাফ) প্রজ্ঞা এক বিস্ময়কর জগত। নিজের আমল এবং জীবন চলার পথকে সঠিক করার লক্ষ্যে এই অমূল্য উক্তিগুলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।
📌 সংকলন পরিচিতি:
মূল সংকলক: ফাহদ বিন আবদুল
আজিজ আবদুল্লাহ আল-শুওয়াইরিখ (২০২২)।
বিষয়বস্তু: মানুষের
প্রকৃতি, চরিত্র এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে সালাফদের
জ্ঞানগর্ভ উক্তি।
✒ এডিটর ও ডিজিটাল বাংলা অনুবাদক: রাসিকুল
ইসলাম।
প্রকাশের তারিখ: ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
📜 সালাফদের অমূল্য বাণী: মানুষের প্রকৃতি ও চরিত্র
“বিস্ময়কর এক জগৎ: নিজেকে চেনার পালা”
সালাফদের
(ইসলামের প্রাথমিক যুগের মনীষী) প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের স্বভাব ও
মনস্তত্ত্বের এক অনন্য সংকলন।
মূল/সংকলক: ফাহদ বিন আবদুল আজিজ আবদুল্লাহ
আল-শুওয়াইরিখ।
এটি একটি
অনন্য এবং সুবিন্যস্ত সংকলন, যা মানুষের
মনস্তত্ত্ব,
নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিকতার বিভিন্ন দিক নিয়ে ইসলামের
প্রাথমিক যুগের মহান মনীষীদের (সালাফ) অমূল্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে একত্রিত করেছে।
২০২২ সালে প্রকাশিত এই সংকলনটি কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং এটি সালাফদের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের গভীর
চিন্তা-ভাবনার একটি আয়না,
যা মানুষের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি এবং চরিত্রকে আরও গভীর ও
গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এই সংকলনটি কেবল ধর্মীয় পাঠ হিসেবে নয়, বরং আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটেও
অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মানুষের স্বভাব, ব্যক্তিত্বের প্রকারভেদ, গুণাবলী, এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সালাফরা যে গভীর উপলব্ধি
প্রকাশ করেছেন,
তা এই সংকলনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফাহদ বিন
আবদুল আজিজ আবদুল্লাহ আল-শুওয়াইরিখ অত্যন্ত পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সাথে ইসলামের
প্রাথমিক যুগের আলেমদের লেখা থেকে এই মূল্যবান উক্তিগুলি সংগ্রহ করেছেন, এবং সেগুলিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে পাঠক সহজেই তা গ্রহণ
করতে পারে। এই সংকলনে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে মানুষ তাদের চরিত্রের ইতিবাচক দিকগুলি
উন্নত করতে পারে,
কীভাবে নিজের মধ্যে মানবিক গুণাবলী গড়ে তুলতে পারে এবং
কীভাবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে আরও উন্নত জীবনযাপন করতে পারে।
এই মহান
কাজের এডিটর/সংকলন/ডিজিটাল বাংলা অনুবাদকঃ রাসিকুল ইসলাম।
তিনি অত্যন্ত যত্ন ও
নিষ্ঠার সাথে এই সংকলনটিকে ডিজিটাল রূপ দিয়েছেন এবং বাংলায় অনুবাদ করেছেন। রাসিকুল
ইসলাম শুধু অনুবাদই করেননি,
বরং তিনি প্রতিটি উক্তির মূল ভাব এবং গূঢ় অর্থ অক্ষুণ্ণ
রেখে তা সহজে বোঝার উপযোগী করে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই অবদান বাংলাভাষী পাঠকদের
জন্য একটি বড় সম্পদ,
যা তাদের সালাফদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে
সাহায্য করবে।
তারিখঃ ২৭/০৪/২০২৬, এই দিনে এই মূল্যবান সংকলনটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা
হলো। আমরা আশা করি,
এই সংকলনটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, এবং তাদের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও গভীর উপলব্ধি
প্রদানে সাহায্য করবে। এটি কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি জীবনের দিশারী, যা মানুষকে মহান
আল্লাহ তায়ালার কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। সালাফদের জীবনের এই জ্ঞান আজ
আমাদের জীবনের পথে একটি আলোর মিনার, যা আমাদের
সঠিক পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগাবে।
পরম করুণাময়
অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
ভূমিকা: হৃদয়ের
আয়নায় নিজেকে দেখা।
সকল প্রশংসা
জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল
মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম),
তাঁর পরিবার ও
সঙ্গীদের ওপর।
আল্লাহ তাআলা
মানুষকে তাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
যেমন, তিনি বলেছেন: "আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর
সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য" রেফারেন্স:[রুম: ২২]।
মানুষের রং ও
ভাষার মতো তাদের পদমর্যাদা, স্বভাব ও চরিত্রেও ভিন্নতা রয়েছে।
মানুষ যেমন বর্ণ
ও ভাষায় ভিন্ন, তেমনি তারা তাদের মর্যাদা, স্বভাব এবং চরিত্রেও ভিন্ন ভিন্ন। মানুষের স্বভাব ও চরিত্র এক গভীর সমুদ্রের
মতো। এই বিশাল পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসি, কিন্তু কয়জন মানুষের আসল
রূপ আমরা চিনতে পারি? এমনকি আমরা নিজেরাও কি জানি আমাদের
অন্তরের অবস্থা ঠিক কেমন? ইসলামের প্রাথমিক যুগের সেই মহান
মনীষীরা, যাঁদের আমরা 'সালাফ'
হিসেবে জানি, তাঁরা ছিলেন মানুষের মনস্তত্ত্ব
ও আধ্যাত্মিক ব্যাধির প্রকৃত চিকিৎসক। তাঁদের প্রতিটি কথা ও উপদেশ কেবল শব্দ নয়,
বরং জীবন অন্ধকার থেকে আলোতে আসার এক একটি আলোকবর্তিকা। এই সংকলনটি
মূলত সেইসব প্রজ্ঞাবান মনীষীদের অমূল্য বাণীর একটি নির্যাস, যা
আমাদের শেখাবে কীভাবে মানুষের সাথে মিশতে হয় এবং কীভাবে নিজের চরিত্রকে সালাফদের
আদর্শে রাঙাতে হয়।
পরিশেষে: এই ক্ষুদ্র
প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের আমল ও পথচলা যেন সঠিক হয় এবং আমরা যেন
চারিত্রিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারি। আশা করি, এই সংকলনটি আপনার
দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে ইনশাআল্লাহ।
1)জ্ঞান
ও শিখনের গুরুত্ব, মানুষ তিন শ্রেণীঃ
আবু
দারদা (রা.) বলেন:
মানুষ তিন
প্রকার:
১. আলেম
(জ্ঞানী),
২. মুতাআল্লিম
(ছাত্র বা জ্ঞান অন্বেষণকারী),
৩. অকেজো মূর্খ
(যাদের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই)।
ব্যাখ্যা: সমাজে জ্ঞানের গুরুত্ব বুঝাতে এই উক্তিটি
করা হয়েছে। একজন হয় শিক্ষক, না হয় শিক্ষার্থী। এর বাইরে যারা জ্ঞান
অর্জন বা বিতরণের কোনোটিতেই নেই, তারা লক্ষ্যহীন।
যে ব্যক্তি জানে অথবা জানার চেষ্টা করে, সেই প্রকৃত মানুষ। এর বাইরে যারা শুধু
খেয়ে-পরে বেঁচে থাকে, তাদের 'অসার'
বা লক্ষ্যহীন বলা হয়েছে।
শিক্ষণীয়: সারাজীবন হয় শেখার মধ্যে থাকতে হবে, না হয় শেখানোর মধ্যে। নিষ্ক্রিয় থাকা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের জীবনকে হয় একজন শিক্ষক (আলেম) হিসেবে অথবা একজন
ছাত্র (শিক্ষার্থী) হিসেবে অতিবাহিত করা উচিত। জ্ঞানহীন জীবন পশুর সমান।
২.
ফেরেশতা, পশু
ও শয়তান সদৃশ মানুষ
মুসলিম
বিন মাইমুন আল-খাওয়াস: মানুষ তিন প্রকার:
একদল ফেরেশতাদের
মতো, একদল চতুষ্পদ জানোয়ারের মতো এবং অন্য দল
শয়তানের মতো।
ব্যাখ্যা:
মানুষের গুণাবলি অনুসারে তাদের রূপকভাবে তিন ভাগে ভাগ করা
হয়েছে। ফেরেশতা তুল্য (যারা সর্বদা ইবাদত ও কল্যাণে লিপ্ত), জানোয়ার তুল্য (যারা কেবল খাওয়া ও লালসা নিয়ে ব্যস্ত) এবং
শয়তান তুল্য (যারা অন্যের ক্ষতি ও পাপাচার ছড়ায়)।
শিক্ষণীয়: আমাদের লক্ষ্য হওয়া
উচিত কুপ্রবৃত্তি দমন করে ফেরেশতাদের মতো উচ্চতর নৈতিক চরিত্র অর্জন করা।
৩. খাবার,
ওষুধ ও রোগের মতো মানুষ:
খলিফা
আল-মামুন: মানুষ
তিন ধরনের:
১. যারা খাবারের
মতো (সবসময় প্রয়োজন),
২. একদল ওষুধের
মতো যাদের কেবল অসুস্থতার সময় প্রয়োজন হয়),
৩. যারা রোগের
মতো (সব অবস্থাতেই অপছন্দনীয়)।
ব্যাখ্যা: খাবার যেমন
প্রতিদিন প্রয়োজন,
তেমনি কিছু মানুষ (আলেম ও নেককার) আমাদের সবসময় প্রয়োজন।
কিছু মানুষ বিপদে (ওষুধের মতো) কাজে লাগে। আর কিছু মানুষ রোগের মতো, যারা কেবল বিরক্তি ও পাপ বৃদ্ধি করে।
শিক্ষণীয়: বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হওয়া। নিজেকে
এমনভাবে গড়ে তোলা যেন মানুষ আপনাকে 'খাবার' বা 'ওষুধের'
মতো উপকারী মনে
করে।
৪. ঈমানের পথে তিন অবস্থা (ইমাম কুরতুবী)
4.ইমাম কুরতুবী (শুমাইত আল-আজলান থেকে বর্ণনা করেন): মানুষ তিন প্রকার:
প্রথম জনঃ এমন ব্যক্তি যে জীবনের শুরু থেকেই ভালোর পথে চলে এবং
মৃত্যু পর্যন্ত তার ওপর অটল থাকে; সে হলো অগ্রগামী ও
নৈকট্যপ্রাপ্ত।
দ্বিতীয় জন: যে জীবনের শুরুতে
পাপে লিপ্ত ছিল,
দীর্ঘ সময় গাফেল ছিল, কিন্তু পরে
তওবা করে ফিরে আসে এবং তওবার ওপরই তার মৃত্যু হয়; সে হলো ডানপন্থী (আসহাবুল ইয়ামীন)।
তৃতীয় জন: যে সারাজীবন
পাপাচারে লিপ্ত ছিল এবং সেই অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়েছে; সে হলো বামপন্থী (আসহাবুল শিমাল)। সে হলো 'আসহাবুল শিমাল' (বামদিকের হতভাগ্যরা)।
ব্যাখ্যা: এটি মানুষের জীবনের শেষ পরিণতির ওপর ভিত্তি করে বিন্যাস।
আজীবন ভালো থাকা (নৈকট্যপ্রাপ্ত), ভুল শুধরে ফিরে আসা
(ডানপন্থী) এবং আমৃত্যু পাপে থাকা (বামপন্থী)।
শিক্ষণীয়: অতীত যাই হোক না কেন, তওবার দরজা
সবসময় খোলা। জীবনের শেষ আমলটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
5. কল্যাণের পথে মানুষ চার প্রকার (ইমাম মাওয়ার্দী):
যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরুতেই ভালো কাজ করে (তারা হলো দানশীল)।
যারা অন্যকে দেখে অনুসরণ করে ভালো কাজ করে (তারা হলো প্রজ্ঞাবান/বুদ্ধিমান/হাকিম)/)।
যারা বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে ভালো কাজ ত্যাগ করে (তারা হলো হতভাগ্য)।
যারা মন্দকে ভালো মনে করে ভালো কাজ ছেড়ে দেয় (তারা হলো নিকৃষ্ট)।
ব্যাখ্যা: এখানে মানুষের কাজের প্রেরণা বা ‘মোটিভেশন’ বিশ্লেষণ করা
হয়েছে। কেউ উদারতা থেকে করে, কেউ বুদ্ধি খাটিয়ে, কেউ ভয়ে পথ হারায় আর কেউ মূর্খতাবশত মন্দকে ভালো মনে করে।
শিক্ষণীয়: ভালো কাজের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হওয়া (দানশীলতা) এবং সঠিক
জ্ঞান রাখা জরুরি যেন মন্দকে ভালো মনে করে পথভ্রষ্ট না হতে হয়।
6. মানুষের
স্বভাবে পশুর সাদৃশ্য:
ইমাম খাত্তাবী
(সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ থেকে বর্ণনা করেন): পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যার মধ্যে
কোনো না কোনো পশুর সাদৃশ্য নেই।
কেউ সিংহের মতো
আক্রমণাত্মক,
কেউ নেকড়ের মতো
ক্ষিপ্র,
কেউ কুকুরের মতো
ঘেউ ঘেউ করে,
কেউ ময়ূরের মতো
অহংকার প্রদর্শন করে।
আবার কেউ শুকরের
মতো—যাকে উত্তম খাবার দিলে তা গ্রহণ করে না, কিন্তু কেউ মলত্যাগ করে উঠলে তাতে মুখ দেয়।
ঠিক তেমনি কিছু
মানুষ আছে যারা পঞ্চাশটি হিকমতের কথা শুনলেও একটিও মনে রাখে না,
কিন্তু যদি কেউ
সামান্য ভুল করে বা কারো দোষের কথা শুনে, তবে তা সাথে সাথে মুখস্থ করে ফেলে এবং
প্রচার করে।
ব্যাখ্যা: মানুষের ভেতরের
রিপুগুলো একেকটি পশুর স্বভাবের সাথে তুলনীয়। বিশেষ করে শুকরের সাথে তুলনাটি
অত্যন্ত গভীর—যারা অন্যের ভালো গুণ দেখে না কিন্তু সামান্য দোষ পেলেই তা নিয়ে পড়ে
থাকে।
শিক্ষণীয়: নিজের ভেতরের
পশুত্ব (অহংকার, ক্রোধ, পরনিন্দা) দমন
করা মুমিনের প্রধান কাজ।
7.মানুষ পাখির ঝাঁকের মতো:
ইমাম ইবনে কুতাইবাহ বলেন:
মানুষ হলো পাখির ঝাঁকের মতো যারা একে অপরকে অনুসরণ করে। যদি
আজ কেউ নবুওয়াতের দাবি করে (যদিও তারা জানে মুহাম্মদ সা. শেষ নবী)
অথবা কেউ প্রভুত্বের দাবি করে, তবে তার পেছনেও অনুসারী ও সাহায্যকারী পাওয়া যাবে।
ব্যাখ্যা: অধিকাংশ মানুষের
নিজস্ব বিচারবুদ্ধি নেই; মানুষ সাধারণত অন্ধ অনুকরণপ্রিয়। কোনো
যাচাই-বাছাই ছাড়াই তারা ভিড়ের পেছনে দৌড়ায়।
শিক্ষণীয়: সত্যের মাপকাঠিতে
কোনো বিষয় যাচাই না করে কারো অন্ধ অনুসরণ করা উচিত নয়।
8. স্বভাব
ও চরিত্রে মাটির প্রভাব (হাদিস ও ইমাম খাত্তাবীর ব্যাখ্যা)
ইমাম খাত্তাবী (আবু মুসা আল-াশআরী থেকে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ
করেন):
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে পৃথিবীর সব ধরনের মাটির সংমিশ্রণে তৈরি করেছেন।
তাই আদম সন্তানরা মাটির গুণাগুণ অনুযায়ী হয়েছে—কেউ লাল, কেউ কালো, কেউ সাদা, কেউ
সহজ প্রকৃতির/ নরম
স্বভাবের, কেউ কঠোর প্রকৃতির; কেউ মন্দ আবার কেউ উত্তম।”
নবীজি (সা.) এখানে স্পষ্ট করেছেন যে মানুষের স্তর ও চরিত্র
ভিন্ন ভিন্ন। মানুষ বিভিন্ন স্তরের ও চরিত্রের।
কেউ অতি উত্তম যার সাহচর্যে উপকার হয়,
আবার কেউ নিকৃষ্ট যার সান্নিধ্যে ক্ষতি হয়—ঠিক যেমন
মাটির গুণাগুণ অনুযায়ী ফসল ভালো বা মন্দ হয়।
অথবা ঠিক যেমন জমি ভিন্ন ভিন্ন হয়। কোনোটি উর্বর যেখানে
ভালো ফসল ফলে, আবার কোনোটি লবণাক্ত যেখানে বীজ বপন করলে
তা নষ্ট হয়ে যায়।
ব্যাখ্যা: মাটির যেমন বিভিন্ন
রং ও উর্বরতা থাকে, মানুষের মেজাজও তেমন। কেউ নরম, কেউ কঠোর, কেউ উর্বর (উপকারী)।
শিক্ষণীয়: মানুষের স্বভাবের
ভিন্নতা মেনে নিতে হবে এবং উর্বর মাটির মতো উপকারী ও বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
বা সবার মেজাজ এক হবে না। মানুষের সাথে তার স্বভাব ও যোগ্যতা অনুযায়ী আচরণ করতে
হবে।
9.প্রশংসা ও নিন্দার ক্ষেত্রে মানুষের স্তর:
ইমাম ইবনে হাজম বলেন: মানুষ তাদের স্বভাব অনুযায়ী কয়েক স্তরের:
১)একদল সামনে ও
পেছনে উভয় অবস্থায় প্রশংসা করে—এটি চাটুকার
ও লোভীদের স্বভাব বা তোষামোদকারী ও লোভী মানুষের স্বভাব।
২)একদল সামনে ও
পেছনে উভয় অবস্থায় নিন্দা করে—এটি অভদ্র ও
ছিদ্রান্বেষীদের কাজ। বা এটি অসভ্য ও নির্লজ্জ পরনিন্দাকারীদের স্বভাব।
৩)একদল সামনে
প্রশংসা করে কিন্তু পেছনে নিন্দা করে—এটি মুনাফিকদের স্বভাব।
৪)একদল সামনে
নিন্দা করে কিন্তু পেছনে প্রশংসা করে—এটি নির্বোধদের স্বভাব।
তবে মর্যাদাবান ব্যক্তিরা সামনে প্রশংসা বা নিন্দা
উভয়টি থেকে বিরত থাকেন এবং পেছনে কেবল ভালো গুণের আলোচনা করেন।
আর নিরাপদ ব্যক্তিরা সামনে বা পেছনে কোথাও কারো
প্রশংসা বা নিন্দায় জড়ান না।
ব্যাখ্যা: মানুষের আচরণের
সত্যতা ও সামাজিক শিষ্টাচার এখানে ফুটে উঠেছে। চাটুকারিতা ও পরনিন্দা—উভয়ই
বর্জনীয়।
শিক্ষণীয়: সবচেয়ে নিরাপদ হলো
গীবত বর্জন করা এবং কারো অনুপস্থিতিতে তার কেবল ভালো গুণগুলোর আলোচনা করা।
10) অন্তরের কিছু অদ্ভুত স্বভাব:
ইমাম ইবনে হাজম বলেন:
বুদ্ধিমান ব্যক্তির
উচিত নয় কেবল কারো কান্না বা আর্তনাদ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আমি এমন অনেককে দেখেছি যারা চরম কান্না করে নিজেকে মজলুম
প্রমাণ করতে চায়, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে-ই চরম জালেম।
আবার অনেক মজলুমকে দেখেছি যারা শান্ত থাকে এবং অভিযোগ করে
না।
তাই কারো বাহ্যিক রূপ দেখে নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত।
বা যা দেখে বিচারকের মনে হতে পারে সে-ই হয়তো অপরাধী। তাই
এক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া এবং সত্য উদঘাটনে ধৈর্য ধরা উচিত।
ব্যাখ্যা: কান্না বা আবেগের
আতিশয্য সবসময় সত্যের মাপকাঠি নয়। অপরাধীও অনেক সময় কান্নার মাধ্যমে সহানুভূতি
পেতে চায়। জালেম ব্যক্তি অনেক সময় কান্নার নাটক করে সহানুভূতি পেতে চায়, আর প্রকৃত মজলুম অপমানে চুপ থাকে।
শিক্ষণীয়: বিচার-বুদ্ধি ও
সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ না হয়ে ধৈর্য ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করা উচিত।
11) মানুষ হলো খনিজ পদার্থের মতো:
শেখ আবদুল্লাহ বিন আব্দুল গনি খায়্যাত বলেন:
“মানুষ হলো খনিজ পদার্থের মতো”—এটি একটি হাদিসের অংশ। মানুষের
মধ্যে কেউ খাঁটি সোনার মতো যা দীর্ঘ সময় থাকলেও উজ্জ্বলতা হারায় না। আবার কেউ
লোহার মতো যা সময়ের সাথে সাথে কেবল মরিচা ও মালিন্যই বৃদ্ধি করে।
ব্যাখ্যা: সোনা যেমন পুরনো
হলেও মূল্য হারায় না, খাঁটি মানুষও বিপদে বা দীর্ঘ সময়ে
অপরিবর্তিত থাকে। অন্যদিকে নিচু মনের মানুষ লোহার মতো মরিচা ধরে নষ্ট হয়।
শিক্ষণীয়: ঈমান ও আমলের
মাধ্যমে নিজেকে সোনার মতো খাঁটি ও মূল্যবান হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
12)রাতে মানুষের তিনটি অবস্থা:
সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত: রাত হলে মানুষ তিন স্তরে বিভক্ত হয়:
১)যাদের জন্য নেকি
আছে কিন্তু গুনাহ নেই: যারা মানুষের
অসতর্কতা ও রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে ওযু করে সালাত আদায় করে।
২)যাদের ওপর গুনাহ
আছে কিন্তু নেকি নেই: যারা রাতের
অন্ধকারে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপে লিপ্ত হয়।
৩)যাদের নেকিও নেই,
গুনাহও নেই: যারা রাত থেকে সকাল
পর্যন্ত কেবল ঘুমিয়ে কাটায়।
ব্যাখ্যা: রাত মানুষকে পাপের
সুযোগ দেয় আবার ইবাদতেরও। যারা ঘুমিয়ে কাটায় তারা নিরপেক্ষ থাকলেও ইবাদতকারীরা
অগ্রগামী।
শিক্ষণীয়: রাতের নির্জনতাকে
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার কাজে ব্যবহার করা উচিত।
13-16)মহানুভব মানুষ/শ্রেষ্ঠ
আত্মার অধিকারী:
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন:
সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ আত্মার অধিকারী যার আনন্দ হলো
আল্লাহকে জানার মধ্যে, তাঁকে ভালোবাসার মধ্যে এবং তাঁর সন্তুষ্টি
অর্জনের চেষ্টার মধ্যে। এর বিপরীতে এমন মানুষও আছে যাদের আনন্দ কেবল নিকৃষ্ট পাপ ও
নোংরামির মধ্যে।
ব্যাখ্যা:
উপকারী মানুষ সে যে আপনাকে জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, আর ক্ষতিকর সে যে পাপে সাহায্য করে। শ্রেষ্ঠ আনন্দ হলো
আল্লাহকে ভালোবাসার মাঝে।
শিক্ষণীয়: বন্ধু ও সঙ্গী
নির্বাচনে বিচার করতে হবে—সে কি আমাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাচ্ছে নাকি আল্লাহ থেকে
দূরে সরাচ্ছে।
মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট ব্যক্তি/ক্ষতিকর মানুষ:
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন:
দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ অন্যের ক্ষতি করে এক ধরণের পৈশাচিক
আনন্দ পায়।
অনেক মানুষ আছে যাদের দিনটি ততক্ষণ ভালো কাটে না যতক্ষণ না
তারা কাউকে কষ্ট দেয়। নিজের ভেতরের বিষাক্ততা অন্যের ওপর ঢেলে দেওয়ার পর সে
স্বস্তি অনুভব করে।
আপনার ন্য সবচেয়ে উপকারী মানুষ:
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন:
আপনার জন্য সবচেয়ে উপকারী সেই ব্যক্তি, যে আপনাকে তার মাধ্যমে ভালো কাজ করার বা কল্যাণ করার সুযোগ করে
দেয়। প্রকৃতপক্ষে তার মাধ্যমে আপনিই বেশি উপকৃত হচ্ছেন।
আপনার জন্য সবচাইতে ক্ষতিকর মানুষ:
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন:
আপনার জন্য সবচাইতে ক্ষতিকর সেই ব্যক্তি, যে আপনাকে তার মাধ্যমে আল্লাহর নাফরমানি বা পাপে লিপ্ত হওয়ার
সুযোগ করে দেয়। সে আসলে আপনার ক্ষতি ও ধ্বংসের পথে সাহায্যকারী।
লক্ষ্যহীন মূর্খ মানুষ (হামাজ):
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন:
(যারা মূর্খ ও নির্বোধ) এরা হলো সমাজের
নির্বোধ ও অজ্ঞ শ্রেণী। তারাই ধর্মের জন্য সবচাইতে ক্ষতিকর। তারা সংখ্যায় বেশি
হলেও আল্লাহর কাছে গুরুত্বহীন বা মর্যাদা নেই। তারা প্রতিটি ফিতনার জ্বালানি
হিসেবে কাজ করে।
লক্ষ্যহীন মূর্খ মানুষ (ইবনুল কায়্যিম)
ব্যাখ্যা:
যাদের নিজস্ব কোনো চিন্তা নেই এবং হুজুগে চলে, তারাই ফিতনার সময় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
শিক্ষণীয়: জ্ঞান অর্জন করে
নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা উচিত যেন কেউ ভুল পথে ব্যবহার করতে না পারে।
আত্মার শ্রেষ্ঠত্ব, উপকারী ও ক্ষতিকর মানুষ (ইবনুল কায়্যিম)
ব্যাখ্যা: উপকারী মানুষ সে যে
আপনাকে জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, আর ক্ষতিকর সে যে
পাপে সাহায্য করে। শ্রেষ্ঠ আনন্দ হলো আল্লাহকে ভালোবাসার মাঝে। যে আপনাকে
দিয়ে ভালো কাজ করায় সে আপনার শ্রেষ্ঠ বন্ধু, আর যে আপনাকে পাপে
উৎসাহ দেয় সে আপনার ধ্বংসকারী।
শিক্ষণীয়: বন্ধু ও সঙ্গী
নির্বাচনে বিচার করতে হবে—সে কি আমাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাচ্ছে নাকি আল্লাহ থেকে
দূরে সরাচ্ছে।
17)মানুষ শেষ হয়ে গেছে, শুধু নামধারী কিছু রয়ে গেছে/ মানুষ চলে গেছে,
অবশিষ্ট আছে ‘নাসনাস’:
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:
আসল মানুষ শেষ হয়ে গেছে,
এখন কেবল ‘নাসনাস’ বাকি আছে। জিজ্ঞাসা করা হলো—নাসনাস কী? তিনি বললেন: যারা দেখতে মানুষের মতো কিন্তু স্বভাবে মানুষ নয়। বা
"যারা মানুষের বেশ ধরে কিন্তু মানুষের গুণাগুণ তাদের মধ্যে
নেই।"
ব্যাখ্যা: মানুষের অবয়ব থাকলেও মনুষ্যত্ব বা বিবেক হারিয়ে ফেলা
ব্যক্তিরাই নাসনাস।
শিক্ষণীয়: শুধু শারীরিক গঠন নয়, নৈতিকতা ও
মানবিক গুণাবলিই মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখে।
18)সবচেয়ে সুখী মানুষ/পরম
সুখী মানুষ:
সাফওয়ান বিন আমর বলেন: সবচাইতে সুখী সেই দেহগুলো যা মাটির নিচে আজাব থেকে নিরাপদ আছে এবং সওয়াবের
প্রতীক্ষায় আছে।
ইবনুল কায়্যিম বলেন: একজন ‘যাহিদ’ (দুনিয়াবিমুখ) ব্যক্তিই হলো মনের দিক থেকে সবচাইতে সুখী ও
প্রশান্ত।
ব্যাখ্যা:
প্রকৃত সুখ কবরের আজাব থেকে মুক্তি ও দুনিয়াবিমুখতায়। আর
প্রকৃত বুদ্ধিমান সে,
যে আল্লাহর অনুগত।
শিক্ষণীয়: দুনিয়ার অস্থায়ী
সুখের চেয়ে আখেরাতের স্থায়ী শান্তিই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
19)শ্রেষ্ঠ ও নিকৃষ্ট মানুষ:
শ্রেষ্ঠ মানুষ: শেখ মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব বলেন: শ্রেষ্ঠ মানুষ সেই, যে
অন্যের ভালো দেখে আনন্দিত হয়।
নিকৃষ্ট মানুষ: ইবনে উয়াইনাহ বলেন: লোকমান (আ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো—সবচাইতে নিকৃষ্ট মানুষ কে? তিনি বললেন: যে জনসমক্ষে মন্দ কাজ করতে লজ্জাবোধ করে না।
জাফর বিন মুহাম্মদ বলেন: সবচাইতে নিচ ব্যক্তি সে, যে কী বলছে বা
তাকে নিয়ে কী বলা হচ্ছে—তার পরোয়া করে না।
ব্যাখ্যা:
অন্যের ভালো দেখে যে খুশি হয় সে শ্রেষ্ঠ; আর যে প্রকাশ্যে মন্দ করতে লজ্জিত হয় না সে নিকৃষ্ট।
শিক্ষণীয়: লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।
মানুষের সামনে নিজের মর্যাদা রক্ষা করা উচিত।
20)সবচাইতে বুদ্ধিমানঃ
সালামা বিন দিনার বলেন:
সবচাইতে বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর আনুগত্য করতে
সক্ষম হয়েছে এবং তা অনুযায়ী আমল করে, অতঃপর
মানুষকে সেদিকে আহ্বান করে।
21)সবচেয়ে নির্বোধ মানুষ:
উমর বিন আবদুল আজিজ (র.) জিজ্ঞেস করলেন:
সবচেয়ে নির্বোধ কে? সবাই বলল: সবচাইতে বড় নির্বোধ সেই ব্যক্তি যে অন্যের দুনিয়া
সাজাতে গিয়ে নিজের আখেরাত বিক্রি করে দেয়। তিনি বললেন: "আমি কি তার চেয়েও বড়
নির্বোধের কথা বলব না? সে হলো ওই ব্যক্তি যে অন্যের দুনিয়ার
স্বার্থে নিজের আখেরাতকে বিক্রি করে দেয়।"
22)সবচেয়ে অজ্ঞ মানুষ:
ফুদাইল বিন ইয়াজ বলেন: সবচাইতে অজ্ঞ সেই ব্যক্তি যে নিজের আমল বা নেকি নিয়ে বড়াই করে।
ব্যাখ্যা: অন্যের স্বার্থে নিজের আখেরাত হারানোই সবচেয়ে বড় বোকামি। আর
নিজের আমল নিয়ে বড়াই করা চূড়ান্ত অজ্ঞতা।
শিক্ষণীয়: নিজের আমল নিয়ে কখনও অহংকার করা যাবে না এবং অন্যের খুশির
জন্য আল্লাহর অবাধ্য হওয়া যাবে না। আখেরাত নষ্ট করে অন্যের দুনিয়া সাজানো সবচেয়ে
বড় বোকামি। আর নিজের আমল নিয়ে অহংকার করা চরম মূর্খতা।
23)মানুষের মধ্যে শক্তির সমন্বয় কম:
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন:
মানুষের মধ্যে সামর্থ্য বা শক্তির সমন্বয় খুব কম দেখা যায়।
এজন্য উমর (রা.) বলতেন: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পাপাচারী ব্যক্তির
কর্মক্ষমতা এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তির অক্ষমতা সম্পর্কে অভিযোগ করছি।"
ব্যাখ্যা: অনেক সময় ভালো মানুষের ক্ষমতা থাকে না, আবার খারাপ
মানুষের অনেক ক্ষমতা থাকে। এটি সমাজের একটি বড় সংকট।
শিক্ষণীয়: যোগ্য ও সৎ মানুষের ক্ষমতায় আসা এবং সামর্থ্য অর্জন করা জরুরি।
24)সবচেয়ে বেশি আনন্দিত ও দুঃখিত ব্যক্তি:
আমের বিন কায়েস বলেন:
নবীজি (সা.) সাহাবীগণ আমাকে বলেছেন: "দুনিয়াতে যারা সবচেয়ে বেশি আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকে, কিয়ামতের দিন তারাই সবচেয়ে বেশি শোকাহত হবে। আর দুনিয়াতে যারা
(আল্লাহর ভয়ে) বেশি কাঁদে, কিয়ামতের দিন তারাই সবচেয়ে বেশি
হাসবে।"
ব্যাখ্যা: দুনিয়ার অবৈধ আনন্দ
আখেরাতে দুঃখ আনবে,
আর দুনিয়ার খোদাভীতি আখেরাতে হাসি আনবে।
শিক্ষণীয়: দুনিয়াকে পরকালের
শস্যক্ষেত্র মনে করে সংযমী জীবন যাপন করা।
25)মানুষ যা জানে না তার শত্রু:
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: মানুষ যা জানে না বা যার সম্পর্কে জ্ঞান নেই, সাধারণত সেটিরই শত্রুতা করে।
ব্যাখ্যা:
মানুষ সাধারণত যে বিষয়ে জ্ঞান রাখে না, সেটিকে ঘৃণা বা অস্বীকার করে।
শিক্ষণীয়: কোনো বিষয়ে বিষোদগার
করার আগে সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা।
26)প্রকৃত মানুষ তো আলেমগণ:
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারককে জিজ্ঞেস করা হলো: প্রকৃত মানুষ কারা? তিনি
বললেন: "আলেমগণ (বিদ্বানরা)।"
ব্যাখ্যা: যাদের জ্ঞান ও
প্রজ্ঞা আছে তারাই প্রকৃত মানুষ, কারণ তারাই
সৃষ্টির রহস্য বোঝে।
শিক্ষণীয়: ইলম বা জ্ঞান
অর্জনের মাধ্যমেই পূর্ণ মানুষ হওয়া সম্ভব।
27)মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন অসম্ভব:
বিশ্র আল-হাফি বলেন: সৃষ্টিজীবের সন্তুষ্টি অর্জন করা এমন এক লক্ষ্য যা কখনো ছোঁয়া সম্ভব নয়।
ইমাম শাফেয়ী বলেন: মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করা অসম্ভব। মানুষের সমালোচনা থেকে বাঁচার কোনো পথ
নেই।
সুফিয়ান সওরী বলেন: মানুষের সন্তুষ্টি এমন এক লক্ষ্য যা অর্জন করা যায় না।
ব্যাখ্যা: মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন
অসম্ভব। তাই মানুষের সমালোচনার ভয় না করে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে মনোযোগ দেওয়া
উচিত। আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না। মানুষ ফেরেশতাদেরও সমালোচনা করে, এমনকি আল্লাহর বিরুদ্ধেও অভিযোগ করে।
শিক্ষণীয়: মানুষকে খুশি করার
পেছনে না ছুটে আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা করা। কারণ মানুষের মন পরিবর্তনশীল। মানুষের
মুখ বন্ধ করার চেষ্টা না করে নিজের আমল ঠিক করা। প্রকৃত মানুষ বা আলেম হওয়ার
চেষ্টা করা।
28. মানুষের কার্যাবলীকে বাহ্যিক অবস্থার ওপর
বিচার করা
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেন: "মানুষের বিষয়াদি বাহ্যিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যে
ব্যক্তি দ্বীনের নিদর্শন প্রকাশ করবে, তার ওপর মুসলিমদের
বিধান জারি হবে, যতক্ষণ না তার বিপরীত কিছু প্রকাশ
পায়।"
তিনি আরও বলেন: "এর অর্থ হলো বিধান প্রয়োগ হবে বাহ্যিকের ওপর, আর
অন্তরের খবর আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা হবে।"
29. মানুষের কাছে কিছু না চাওয়া (অমুখাপেক্ষিতা)
হাসান (বসরী) বলেন: "তুমি মানুষের কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মানিত থাকবে যতক্ষণ তাদের হাতের
জিনিসের (সম্পদ) প্রতি লোভ করবে না। যখনই তা করবে, তারা
তোমাকে হালকা মনে করবে, তোমার কথা অপছন্দ করবে এবং তোমাকে
ঘৃণা করবে।"
বিশর বিন হারিস আল-হাফী বলেন: "মুমিনের মর্যাদা হলো মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষী
থাকা।"
ইমাম ইবনে হিব্বান বলেন: "বিচক্ষণ ব্যক্তির উচিত মানুষের প্রতি লোভ ত্যাগ করা। কারণ যা বিদ্যমান তার
প্রতি লোভ করা তাৎক্ষণিক দারিদ্র্য।"
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: "সৃষ্টির কাছে বান্দার মর্যাদা তখনই সর্বোচ্চ হয় যখন সে
তাদের কাছে কোনোভাবেই মুখাপেক্ষী থাকে না। এমনকি এক ঢোক পানির জন্য অভাবী হলেও
তোমার মর্যাদা সেই পরিমাণ কমে যাবে।"
30. মানুষের কাছে কিছু না চাওয়া (অমুখাপেক্ষিতা)
হাসান (বসরী) বলেন: "তুমি মানুষের কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মানিত থাকবে যতক্ষণ তাদের হাতের
জিনিসের (সম্পদ) প্রতি লোভ করবে না। যখনই তা করবে, তারা
তোমাকে হালকা মনে করবে, তোমার কথা অপছন্দ করবে এবং তোমাকে
ঘৃণা করবে।"
বিশর বিন হারিস আল-হাফী বলেন: "মুমিনের মর্যাদা হলো মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষী
থাকা।"
ইমাম ইবনে হিব্বান বলেন: "বিচক্ষণ ব্যক্তির উচিত মানুষের প্রতি লোভ ত্যাগ করা। কারণ যা বিদ্যমান তার
প্রতি লোভ করা তাৎক্ষণিক দারিদ্র্য।"
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: "সৃষ্টির কাছে বান্দার মর্যাদা তখনই সর্বোচ্চ হয় যখন সে
তাদের কাছে কোনোভাবেই মুখাপেক্ষী থাকে না। এমনকি এক ঢোক পানির জন্য অভাবী হলেও
তোমার মর্যাদা সেই পরিমাণ কমে যাবে।"
31. মানুষের ওপর আশা ও ভরসা না রাখা
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: "কোনো সৃষ্টিই মূলত তোমার উপকারের উদ্দেশ্য রাখে না...
বরং তারা তোমার মাধ্যমে নিজের উপকার চায়। বিচক্ষণ ব্যক্তি জানে যে, মানুষের অভাব তাকে অন্ধ করে দেয়, তারা তোমার ক্ষতির
পরোয়া করবে না যদি তাতে তাদের প্রয়োজন পূরণ হয়।"
তিনি আরও বলেন: "যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে মানুষের ভয় ও আশা অন্তর থেকে মুছে ফেলে, সেই প্রকৃত লাভবান। সৃষ্টি তোমার কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না আল্লাহর
অনুমতি ছাড়া।"
32. মানুষের সাথে মেলামেশার আদব
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: "মানুষের সাথে মেলামেশা করো, তাদের
সাথে এমন আচরণ করো যা তারা পছন্দ করে (ভালো কাজে), কিন্তু
নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দিও না।"
ইমাম শাফেয়ী বলেন: "মানুষ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকা শত্রুতা তৈরি করে, আর খুব বেশি মেলামেশা খারাপ বন্ধু টানে। তাই মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।"
ইমাম ইবনে হাজম বলেন: "মানুষের সাথে মেলামেশায় দুটি বড় দোষ আছে: এক. অসতর্কতায় গোপন রহস্য ফাঁস
হয়ে যাওয়া। দুই. গীবত বা পরনিন্দায় জড়িয়ে পড়া।"
33. মুমিনকে আনন্দ দেওয়া এবং ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা
ইয়াহইয়া বিন মুয়ায আল-রাযী বলেন: "মুমিনের প্রতি তোমার আচরণ যেন তিনটি হয়: যদি উপকার করতে
না পারো তবে ক্ষতি করো না, যদি আনন্দ দিতে না পারো তবে কষ্ট
দিও না, আর যদি প্রশংসা করতে না পারো তবে নিন্দা করো
না।"
আল্লামা সা'দী
বলেন: "নরম কথা ও দোয়ার মাধ্যমে মুমিনের
অন্তরে প্রশান্তি দেওয়া উচিত।"
34. মানুষের কথাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা
আব্দুল আজিজ বিন ওমর বলেন: "আমার পিতা আমাকে বলতেন: হে বৎস, কোনো
মুসলিমের মুখ থেকে বের হওয়া কথাকে খারাপ অর্থে নিও না, যতক্ষণ
সেটির ভালো কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়।"
35. উত্তম চরিত্র অবলম্বন এবং অসদাচরণ বর্জন
যুন্নুন বলেন: "মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকে সেই ব্যক্তি, যার
চরিত্র সবচেয়ে খারাপ।"
ইবনে হিব্বান বলেন: "বিচক্ষণ ব্যক্তির উচিত সচ্চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের প্রিয় হওয়া। কারণ
উত্তম চরিত্র গুনাহকে গলিয়ে দেয় যেমন সূর্য বরফকে গলিয়ে দেয়।"
আল্লামا সা'দী বলেন: "রাসূল (সা.) ছিলেন সহজ, কোমল এবং
মানুষের নিকটবর্তী। তিনি প্রতিবেশীর সাথে উপহার, সদকা এবং
সুন্দর আচরণের মাধ্যমে সুসম্পর্ক রাখার নির্দেশ দিতেন।"
36. মানুষের দোষ না খুঁজে নিজের দোষ সংশোধন করা
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন: "তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের চোখের সামান্য কুটো দেখে,
কিন্তু নিজের চোখের বিশাল কাঠটি (বড় দোষ) ভুলে যায়।"
ইমাম ইবনে হিব্বান বলেন: "বিচক্ষণ ব্যক্তির কাজ হলো মানুষের দোষ অনুসন্ধান (তাজাসসুস) না করে নিজের
দোষ সংশোধনে ব্যস্ত থাকা।"
37. রাগান্বিত ব্যক্তির সাথে ধৈর্যশীল আচরণ
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন: "যখন দেখবে তোমার সঙ্গী রাগান্বিত হয়ে অসংলগ্ন কথা বলছে, তখন তাকে গুরুত্ব দিও না। তার অবস্থা তখন মাতালের মতো। তুমি ধৈর্য ধরো,
কারণ শয়তান তার ওপর চড়াও হয়েছে। সে শান্ত হলে অবশ্যই লজ্জিত হবে এবং
তোমার ধৈর্যের মর্যাদা বুঝবে।"
38. বিবিধ উপদেশ
আয়শা (রা.) বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানি করে মানুষের সন্তুষ্টি চায়, প্রশংসাকারীরাই একসময় তার নিন্দুক হয়ে যায়।"
ইব্রাহিম বিন আদহাম বলেন: "যা নিজের জন্য অপছন্দ করো, তা
অন্যের জন্য করো না।"
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: "মানুষের সাথে তাদের বুদ্ধি ও জ্ঞান অনুযায়ী কথা বলা উচিত।"
ব্যাখ্যা ও শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
২৬. মানুষের কার্যাবলীকে বাহ্যিক অবস্থার ওপর
বিচার করা
ব্যাখ্যা: ইসলাম আমাদের
শিখিয়েছে আমরা কারো মনের খবর জানি না। তাই কাউকে কাফির বা পাপিষ্ঠ বলার অধিকার
আমাদের নেই যতক্ষণ না সে প্রকাশ্য কোনো লঙ্খন করে। তাই কেউ যদি প্রকাশ্যে নিজেকে
মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ইসলামের নিয়ম মানে, তবে আমরা তাকে মুসলিম হিসেবেই গ্রহণ করব। তার মনে কী আছে তা আল্লাহর ওপর
ছেড়ে দিতে হবে।
বাস্তব প্রয়োগ: সামাজিক জীবনে কাউকে বিনা প্রমাণে
'পাপিষ্ঠ' বা 'মুনাফিক' হিসেবে চিহ্নিত করা থেকে বিরত থাকা। কারো নিয়ত নিয়ে সন্দেহ না করে তার
প্রকাশ্য ভালো কাজকে সাধুবাদ জানানো।
২৭ ও ২৮. মানুষের কাছে কিছু না চাওয়া (অমুখাপেক্ষিতা)
ব্যাখ্যা: মানুষের কাছে হাত
পাতলে নিজের সম্মান কমে যায়। ইবনে তাইমিয়্যাহর কথা অনুযায়ী, এমনকি এক ঢোক পানির জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাও মানুষের
ব্যক্তিত্বকে খাটো করে।
বাস্তব প্রয়োগ:আত্মমর্যাদা
বজায় রাখতে হলে যতটুকু সম্ভব নিজের সামর্থ্যে চলার চেষ্টা করতে হবে। একমাত্র
আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।
২৯. মানুষের ওপর আশা ও ভরসা না রাখা
ব্যাখ্যা: মানুষ
স্বভাবগতভাবেই স্বার্থপর হতে পারে। ইবনুল কাইয়্যিম বুঝিয়েছেন যে, মানুষ যদি আপনার উপকার করে তবে তার পেছনেও কোনো না কোনো
স্বার্থ থাকে। বা মানুষের ভালোবাসা বা উপকার অনেক সময় স্বার্থের জালে বন্দি থাকে। কিন্তু
আল্লাহ নিঃস্বার্থভাবে দান করেন।
শিক্ষণীয়/বাস্তব
প্রয়োগ: মানুষের কাছে অতিরিক্ত
প্রত্যাশা না রাখা। এতে যেমন কষ্ট পাওয়ার সম্ভাবনা কমে, তেমনি মানসিক প্রশান্তি ও আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল)
বৃদ্ধি পায়।
৩০. মানুষের সাথে মেলামেশার আদব:
ব্যাখ্যা: ভারসাম্য বা
মধ্যপন্থা। ইমাম শাফেয়ী ও ইবনে মাসউদের (রা.) বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের সাথে একদম মিশব না—এমনটি নয়, আবার
সারাক্ষণ আড্ডায় ডুবে থাকাও ঠিক নয়। অতিরিক্ত মেলামেশা সময়ের অপচয় ও গীবতের কারণ
হয়, আবার একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকা একাকীত্ব ও শত্রুতা তৈরি
করে।
শিক্ষণীয়: সামাজিক হতে হবে
কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গীবত বা পাপের আড্ডায় নিজের দ্বীন নষ্ট না হয়।
মেলামেশায় 'মধ্যপন্থা' হচ্ছে
সর্বোত্তম। নিজের দ্বীন ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে মানুষের সাথে ভালো আচরণ
করা।
৩১. মুমিনকে আনন্দ দেওয়া এবং ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা:
ব্যাখ্যা: যাহইয়া বিন
মুয়াযের মূলনীতি: সামাজিক শান্তি রক্ষার জন্য ৩টি
উপকার করতে না পারলে অন্তত ক্ষতি করবেন না।
খুশি করতে না পারলে অন্তত কষ্ট দেবেন না।
প্রশংসা করতে না পারলে অন্তত নিন্দা করবেন না।
শিক্ষণীয়: নেতিবাচকতা পরিহার
করা। কারো প্রশংসা করতে না পারলে অন্তত চুপ থাকা।
৩২. মানুষের কথাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা
ব্যাখ্যা: কারো অস্পষ্ট কথা
বা কাজকে মন্দ অর্থে গ্রহণ না করে তার সম্ভাব্য ভালো ব্যাখ্যা খোঁজা।
শিক্ষণীয়: ভুল বুঝাবুঝি
এড়ানোর জন্য মানুষের কথাকে ভালো অর্থে নেওয়া উচিত। এটি সামাজিক ঐক্য বজায় রাখে।
৩৩. উত্তম চরিত্র এবং অসদাচরণ বর্জন
ব্যাখ্যা: উত্তম চরিত্র হলো
মানুষের হৃদয়ে প্রবেশের চাবিকাঠি। ইবনে হিব্বানের উপমায়—রোদ যেমন বরফকে গলায়, সচ্চরিত্র তেমনি মানুষের অন্তরের তিক্ততা দূর করে।
শিক্ষণীয়: রাগ বা জেদের
বশবর্তী না হয়ে, মানুষের কাছে প্রিয় হওয়ার সহজ উপায় হলো
হাসিমুখে কথা বলা এবং কোমল আচরণ করা।
৩৪. মানুষের দোষ না খুঁজে নিজের দোষ সংশোধন করা
ব্যাখ্যা: আবু হুরায়রা (রা.)
এর এই উদাহরণটি একটি প্রবাদতুল্য। আমরা অন্যের ছোট ভুল নিয়ে সমালোচনা করি, অথচ নিজের বড় ভুলগুলো দেখি না।
শিক্ষণীয়: অন্যের সমালোচনা
বন্ধ করে নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করা এবং তা সংশোধন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
৩৫. রাগান্বিত ব্যক্তির সাথে ধৈর্যশীল আচরণ
ব্যাখ্যা: রাগ মানুষকে মাতাল
করে ফেলে। তাই রাগান্বিত ব্যক্তির কথার সাথে সাথে উত্তর দিলে ঝগড়া বাড়ে। ইবনুল
জাওযী বলেন, তখন চুপ থাকাটাই বুদ্ধিমত্তা।
শিক্ষণীয়: রাগের মাথায় কেউ
কিছু বললে তাতে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে তার শান্ত হওয়ার অপেক্ষা করা উচিত।
৩৬. বিবিধ উপদেশ
ব্যাখ্যা: আয়েশা (রা.) এর
কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—মানুষকে খুশি করার চেয়ে আল্লাহকে খুশি করা জরুরি। কারণ
আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলে ওই মানুষগুলোও একসময় আপনার বিপক্ষে চলে যাবে।
শিক্ষণীয়: সকল কাজের উদ্দেশ্য
হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি (ইখলাস)। এছাড়া অন্যের জন্য তা-ই পছন্দ করা যা নিজের
জন্য পছন্দ করি—এটি ঈমানের পূর্ণতা।
১. আবু দারদা (রা.)-এর উক্তি (মানুষ ৩ প্রকার):
সূত্র: সুনানে দারেমী (হাদীস নং ২৫৭), ইবনুল কাইয়্যিম তার 'মিফতাহু দারিস সাআদাহ' গ্রন্থে
এটি বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
২. সফিয়ান বিন উয়াইনার উক্তি (পশুর সাথে সাদৃশ্য):
সূত্র: ইমাম খাত্তাবী, 'আল-উযলাহ' (পৃষ্ঠা নং ৬৬)। এটি
মানুষের স্বভাব বিশ্লেষণে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি রেফারেন্স।
৩. ইমাম মাওয়ার্দীর উক্তি (কল্যাণে ৪ প্রকার):
সূত্র: ইমাম মাওয়ার্দী, 'আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দীন' (পৃষ্ঠা
নং ২৪৩)।
৪. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস (আদম আ.-কে মাটির মুষ্টি
থেকে সৃষ্টি):
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ৪৬৯৩), সুনানে তিরমিজি
(হাদীস নং ২৯৫৫)। ইমাম তিরমিজি একে 'হাসান
সহীহ' বলেছেন। হিলইয়াতুল আউলিয়া (৮/১৩৫)মুসনাদে আহমাদ (৩২/৪১৩ (হাদিস নং: ১৯৬৪২), সুনানে তিরমিজি (৫/২০৪) (হাদিস নং: ২৯৫৫), সুনানে আবু দাউদ (৪/২২২,(হাদিস নং: ৪৬৯৩) হাদিসের
মান: সহীহ (সঠিক)।
৫. ইবনে হাযম আল-আন্দালুসী (চরিত্র ও মনস্তত্ত্ব):
সূত্র: ইবনে হাযম, 'আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার' (পৃষ্ঠা
নং ২১-২৫)। এই কিতাবটি মানুষের স্বভাব ও আচরণের ওপর অন্যতম সেরা উৎস।
৬. ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর উক্তিগুলো (সবচেয়ে উপকারী ও
ক্ষতিকর মানুষ):
সূত্র: ইবনুল কাইয়্যিম, 'আল-ফাওয়ায়েদ' এবং 'মাদারিজুস সালিকীন'। বিশেষ করে 'আল-ফাওয়ায়েদ'
গ্রন্থে তিনি মানুষের উপকার ও অপকার নিয়ে এই সূক্ষ্ম আলোচনা করেছেন।
৭. সালমান ফারসী (রা.)-এর বর্ণনা (রাতের ৩ স্তর):
সূত্র: মুসান্নাফে ইবনে
আবি শায়বাহ (হাদীস নং ৩৪৮৪৩)।
৮. ইমাম শাফেয়ী ও সুফিয়ান সাওরী (মানুষের সন্তুষ্টি):
সূত্র: ইমাম যাহাবী, 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' (ইমাম
শাফেয়ীর জীবনী অংশ)।
৯. উমর বিন আব্দুল আজিজ (সবচেয়ে বড় মূর্খ):
সূত্র: ইবনে আবদিল বার্র, 'জামি’উ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদলিহি' (হাদীস নং ৬৪৩)।
১০. শেখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল গণি খাইয়াত (মানুষ খনিজ
সম্পদের মতো):
এটি মূলত সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বিখ্যাত হাদীস "মানুষ স্বর্ণ ও রৌপ্যের খনির ন্যায়" (বুখারী: ৩৩৮৩, মুসলিম: ২৬৩৮)-এর সমসাময়িক ব্যাখ্যা,
যা তিনি তাঁর খুতবা বা নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন।
প্রচারে ও সম্পাদনায়: 🖋️ রাসিকুল ইসলাম
(rasikulindia) 📅
তারিখ: ২৭/০৪/২০২৬


Post a Comment